মণিমঞ্জরী (১)–সায়ন্তন ঠাকুর

Published by admin on

বাইরে ঘন রাত্রি। জমাট আঁধার ছেয়ে আছে চারপাশে। গঙ্গার উঁচু পারের ওপর বংশী দাসের কুটিরে শুধু একখানি মৃদু আলোর রেখা। পরিস্কার করে নিকোনো মাটির দাওয়া পার হয়ে একটি মাত্র ঘর। খোলা জানলা বেয়ে ভেসে আসছে জলের স্পর্শে চঞ্চল বাতাস। কিছু দূরে ঘাটে বাঁধা মাঝি মাল্লাদের অস্পষ্ট গলার স্বর শোনা যাচ্ছে।চৈত্র মাসের খর রোদ্দুরে আজ সারাদিন পুড়েছে শান্তিপুর। হু হু শুকনো বাতাস ছুটে বেরিয়েছে। এখন একটু যেন মেঘ জমেছে পশ্চিম আকাশে। মাঝে মাঝে রুপোলি বিদ্যুতের রেখা আকাশ চিরে ঝলসে উঠছে। ঠাণ্ডা হয়েছে বাতাস।

ঘরের ভিতর কুলুঙ্গির ওপর গিরিধারীর একটি মাটির মূর্তি।ঘন নীল রঙ। হাতে আড়বাঁশি। ভারী মায়ামাখা মুখ। গলায় একটি টাটকা বেলকুঁড়ির মালা। মেঝেতে শীতলপাটি বিছানো। কাঠের ছোট জলচৌকির ওপর খাগের কলম আর দোয়াত। ঘিয়ের প্রদীপ। নরম হলুদ আলোয় আচ্ছন্ন সারা ঘর। একজন অপূর্ব মায়াবী পুরুষ একমনে লিখে চলেছেন। সঘন চুলের গোছা কাঁধ অবধি নেমে এসেছে। কপালে চন্দনের রসকলি।গলায় তুলসী কাঠের মালা। কাছা না করে পরা ধুতি আর গায়ে একটি উত্তরীয় জড়ানো। মুক্তোর মতো অক্ষরে তিনি বড় বড় হরফে নাম লিখেছেন-বদন-চান্দ কোন্ কুন্দারে কুন্দিলে। সারা ঘরে চন্দন আর বেলফুলের গন্ধ জমাট বেঁধে আছে। বাইরের দাওয়া থেকে অবাক বিস্ময়ে তাঁর দিকে চেয়ে আছে বংশীচরণ।পরনে একখানি ধুতি। অনাবৃত দেহ। কপালে চন্দনের তিলক।একটু ইতস্তত করে মৃদু গলায় জিগ্যেস করে
—ঠাকুর, অনেক রাত হল। এবার আহার করে নিন।
কোনও উত্তর আসে না। তন্ময় হয়ে লিখে চলেছেন মানুষটি। মাঝে মাঝে আয়ত দুখানা চোখ তুলে জানলার বাইরের দিকে চেয়ে থাকছেন। শূন্য দৃষ্টি। আকাশ ছেয়ে ফেলেছে মেঘের দল। দমকা বাতাসে দপদপ করে উঠছে প্রদীপের আলো। কী যেন ভাবছেন তিনি। হয়তো ভাবছেন সেই গোরাচাঁদের কথা। দেখা হল না আর এ জীবনে। অথচ তাঁর ফেলে যাওয়া ঘাট, বাড়ির উঠোন, সেই পথ, পথের ধুলো সবই আছে। গতকাল বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। বাড়ির আঙিনায় তুলসী গাছটা অবধি আছে, শুধু তিনি নেই। শূন্য রাজপাট পড়ে আছে। সেই কবে আরেকবার তিনি যেমন চলে গিয়েছিলেন। রাইকিশোরীকে ফেলে।
উত্তর না পেয়ে বংশী আরেকটু গলা তুলে ফের জিগ্যেস করে
—ঠাকুর ?
সম্বিত ফেরে মানুষটির। মুখ ফিরিয়ে একটু হেসে বলেন
—আমি একাহারী বংশী! তুমি আহার করে নাও!
—একটু ফল অন্তত ? পাকা শ্রীফল আছে ঘরে। একটু দি ?
—তোমার ভারী মায়া বংশী, এসো ঘরের ভেতর এসো
ভেতরে এসে ঘরের এককোণে বসে বংশী। দূর থেকে হাতজোড় করে প্রণাম করে। একটি বিদ্যুতের রেখা আকাশের গায়ে ঝলসে ওঠে ঠি ক তখনই। রুপোলি আলোয় ভরে যায় ঘর। পিছু নিয়ে ধেয়ে আসে গম্ভীর শব্দ। উতলা হয়ে ওঠে বাতাস। জোলো গন্ধ লেগে আছে সে বাতাসে। মানুষটি আবার আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকেন বাইরে। একটু পর নিজের লেখার দিকে একপলক চেয়ে বলে ওঠেন, শোনো বংশী, মৃদু হাসি তাঁর ওষ্ঠে
—বদন-চান্দ কোন্ কুন্দারে কুন্দিলে গো
কে না কুন্দিলে দুই আঁখি।
দেখিতে দেখিতে মোর পরাণ যেমন করে
সেই সে পরাণ তার সাখী॥’

বাইরে ঝেঁপে বৃষ্টি এল। সঙ্গে দামাল বাতাস। চৈত্র মাসের কালবৈশাখী।
———————————
(ক্রমশঃ)

Categories: Goddo

0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *