মলিন একতারা ও বাঁকাচরণ দাস–সায়ন্তন ঠাকুর

Published by admin on

গতকাল দুপুরবেলা বাজার যেতে হয়েছিল চাল কেনার জন্য। খিদের অন্ন। যা জোগাড় করার জন্যই আমার যাবতীয় পরিশ্রম। আষাঢ় মাসের বেলা, কখনও জলভরা মেঘের ছায়ার নীচে গাঢ় হয়ে উঠছে আধা মফস্বল শহরের দোকান বাজার ট্যাক্সি অটোর দল আবার পরক্ষণেই ঝলমলে রোদ্দুর মুছে দিচ্ছে শান্ত মায়া। বৃষ্টি আসছে না শুধু তার ইশারা শরীরে নিয়ে ছুটে আসছে এলোমেলো বাতাস। হাঁটছি আমি। ঘাম জমে উঠছে সারা দেহে। ওই বাতাসের ছোঁয়া যেন একটুকরো পুকুর। যার সবুজ জলে ভাসছে মেঘের প্রতিবিম্ব। সেই যে আমার ছোটবেলার মাঠ, সরিকার পুকুর, একটা প্রকাণ্ড বট গাছে দূর মাঠের মাঝে, রাঢ়দেশ থেকেই যেন ছুটে আসছে বাতাস। মুছিয়ে দিচ্ছে ঘাম।
বাজার দোকানপাট অলস। সকালের বিকিকিনি ফুরিয়ে গেছে। মাছবাজার থেকে জল ধোওয়া আঁশটে গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে। চালের দোকানদার অনেকটা নীল দিয়ে কাচা পুরনো ধুতি আর ফতুয়া পরে বসে আছেন বস্তা বস্তা চালের মাঝে পাতা একখানি ছোট টুলের ওপর। কপালে রসকলি। পিছনের দেওয়ালে জয়গুরু বস্ত্রালয়ের ক্যালেণ্ডার। ভারী কোমল রাধারাণী। তাঁর দুহাত ধরে আছেন শ্যাম। একটি বেলকুঁড়ির মালা ক্যালেণ্ডারে। কত তত্ত্ব, কত বিনির্মাণ, কৃষ্ণ চরিত্রের কত টীকা, ভাগবত ব্যাখ্যা, কত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, এম এ ক্লাসের ভারী নোটস সব পার হয়ে এই ছবিটা বড় নিজের মনে হয়। একজন আধা মফস্বল শহরের কিছু না পড়া চাল ব্যবসায়ী তার নিজের মতো করে পুজো করেন সস্তা প্রিন্টে ছাপা ওই ক্যালেণ্ডার। তার ঈশ্বর।
চালের দাম জিগ্যেস করি আমি। দেখতে থাকি পুরনো চাল হাতে নিয়ে। পাশে এসে দাঁড়ান এক বয়স্কা রমণী। দাঁত পড়ে গেছে। আবছা রসকলি। গলায় কণ্ঠী। সাদা মলিন থান। আঁচল ছেঁড়া। একমুখ ফোকলা হাসি। হাতের মুঠোয় ধরা কতগুলো খুচরো পয়সা। জয় রাধে! মৃদু স্বরে বলে চাল দোকানির মুখের দিকে তাকান। গুনগুন করে ওঠেন। ভারী মিষ্টি গলা। আমাকে দেখে একটু ইতস্তত করে থেমেও যান আবার। আমি বলি, থামলেন কেন ? গাইবেন না ?
আষাঢ় মাসের দ্বিপ্রহরে তখন আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে মেঘ। ক্লান্ত বাজারের মাঝে একজন ব্যবসায়ী,একজন ক্রেতা যে ক্ষুধার অন্ন কিনতে এসেছে তার শিশুপুত্র আর স্ত্রীর জন্য এবং একজন যিনি হরিকে ভালবেসে মাধুকরীর ঝুলি নিয়ে বেরিয়েছেন তিনজনের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ওঠেন অলৌকিক সেই পুরুষ। তাঁর জ্ঞান নয়, তাঁর প্রেম এসে বাঁধে আমাদের।
আমার মনে পড়ে যায় মানিক্যহারের দালান, রাধাগোবিন্দ, কতদিন ওই দেব দেখেননি আমাকে। মনে পড়ে শ্রীক্ষেত্র।
আর মনে পড়ে বাঁকাচরণ দাসের কথা। সেও তো এমনই এক মেঘের দিনে অমিতাভকে নিয়ে গেছিল তার ঘরে। কোটাসুরের লাল ধুলোর পথে লেগে আছে তাদের কথা।

সেসব কথাই লিখেছি আমার উপন্যাসে।
প্রকাশিতব্য উপন্যাস: নয়নপথগামী।
প্রকাশক: ধানসিড়ি প্রকাশন।

Categories: Novel

0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *